Akhiruzzaman

“জায়গা দখল: একটি ইসলামিক গল্প যা জীবনের শিক্ষা দেয়”

একজন ডাক্তার, একজন ছাত্র ও একটি ইসলামিক সেমিনার—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক বাস্তব গল্প ‘জায়গা দখল’। জানুন কীভাবে ইসলাম এমন সাধারণ সমস্যারও সমাধান দিয়েছে, হাদীসের আলোকে। একটি গল্পে জীবনের গভীর শিক্ষা।

মানুষ যখন শরীরের অসুস্থতায় ভোগে, তখন দৌড়ে যায় ডাক্তারের কাছে। কিন্তু মনের অসুস্থতা? সেটাও কি সবসময় ডাক্তাররা সারিয়ে তুলতে পারেন? বলা হয়ে থাকে, ইসলামে সব সমস্যার সমাধান আছে। তাহলে কি এমন কিছু হতে পারে না, যেখানে আল্লাহ নিজেই আমাকে একটি অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী করবেন?

এই কথাগুলো লিখে রাখছেন ডাক্তার নাসুম, তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে। নিজের চেম্বারে বসে, প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে ডায়েরির পাতায় ডুবে আছেন তিনি। ইদানীং রাতে ঘুমও ঠিকঠাক হচ্ছে না। জুলাইয়ের রক্তাক্ত দিনগুলো, তারপরে ভয়াবহ বন্যা—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে। কোথাও ঘুরতে যাওয়া দরকার, কিন্তু সময়ের অভাবে কিছুই করা যাচ্ছে না।

হঠাৎ মনে পড়লো ইমনের কথা। ইমন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই, একজন সাধারণ ছাত্র হলেও দ্বীনের প্রতি তার ভালোবাসা অসাধারণ। একদিন নাসুম তাকে বলেছিলেন, “তোমার কি এমন কোনো পরিচিত আছেন, যিনি ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন? এমন কেউ, যিনি আত্মার চিকিৎসা করতে পারেন?”

ইমন বলেছিল, “আছে ভাই, ইনশাআল্লাহ। একদিন নিয়ে যাবো আপনাকে তার কাছে।”
এই কথাটা মনে পড়তেই নাসুম তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা বন্ধ করে ইমনকে ফোন করলেন।
— “ইমন, আজ তো বৃহস্পতিবার। তুমি তো আজ আমাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলে, মনে আছে?”
— “হ্যাঁ ভাই, মনে আছে। আমি তো রেডি হচ্ছি। আপনি ব্যতিক্রম শোরুমের সামনে চলে আসুন, আমি সেখানেই আসছি।”

ঠিক তখনই ওয়ার্ড বয় রফিক হন্তদন্ত করে এসে হাজির। হাপাতে হাপাতে বলল,
— “স্যার, ইমারজেন্সিতে তিনজন মারামারি করা রোগী এসেছে। তাড়াতাড়ি আসেন না হলে কাদের বাহিনীর লোকজন ঝামেলা করে ফেলবে। এমডি স্যারের উপর চাপ দিয়ে রেখেছে কাদের ভাই, যেন তাদের স্পেশাল কেয়ার দেয়া হয়।”

রফিকের মুখ দেখেই বোঝা গেল ঘটনা গুরুতর। মোবাইলটা পকেটে রেখে বললেন,
— “চলো রফিক, দেখি কী অবস্থা। তবে যাওয়ার পথে বলো তো, কী নিয়ে মারামারি?”
রফিক উত্তর দিল,
— “প্রোগ্রামে সামনের চেয়ারে বসা নিয়ে কাদের বাহিনী আর সিদ্দিকী বাহিনীর মধ্যে মারামারি লেগে গেছে। শুনেছি প্রোগ্রামটাই বাতিল হয়ে গেছে।”

হাসপাতালে পৌঁছে একে একে রোগীদের অবস্থা পরীক্ষা করছেন নাসুম সাহেব। একজন অজ্ঞান, বাকিদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। একজনের অবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। নাসুম সাহেব জানতে চাইলেন,

— “আপনার নাম কী? কেন মারামারি করতে গেলেন?”
বুঝতে পারছেন তো, কষ্টটা আপনার পরিবার পাচ্ছে, নেতারা না।” রোগী রেগে গিয়ে বলে, — “আমার নেতার বিরুদ্ধে কিছু বলবেন না, স্যার। একটু সুস্থ হই, সিদ্দিক বাহিনীর সবাইকে দেখে নেব। ওরা হাইব্রিড, সামনে বসার লোভে সবকিছু উল্টে দিচ্ছে!”

নাসুম সাহেব শান্তভাবে শুনলেন, ট্রিটমেন্ট দিলেন, রোগীদের ভর্তি করে দিলেন। নার্সদের বললেন,
— “বাকি দুই রোগীর ব্লাড প্রেশার ফলোআপে রাখো।”

সব কাজ শেষ করে ঘড়ি দেখলেন। ৪০ মিনিট দেরি হয়ে গেছে। ফোনে ১২টা মিসড কল। সঙ্গে সঙ্গে ইমনকে কল করলেন।

— “ইমন, তুমি কোথায়?”
— “ভাই আমি তো মার্কেটের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। আপনি ফোন ধরেন নাই।”
— “আর বলো না ভাই! হসপিটালে মারামারি করা তিনজন রোগী এসেছে। রিকশায় উঠছি, আসছি।”

রিকশা থেকে নেমে হালকা হেসে বললেন,
— “ইমন, অনেক দেরি করে ফেললাম, না?”
— “হ্যাঁ ভাই, দেরি তো করেছেন। কিন্তু নিশ্চয়ই এর পিছনে যৌক্তিক কারণ ছিল। এত কল দিয়েছি, দুঃখিত ভাই।”
— “চলো, হাঁটতে হাঁটতে বলি কী হয়েছে। আজকে হসপিটালে দুই গ্রুপ—কাদের বাহিনী আর সিদ্দিক বাহিনীর—মাঝে সংঘর্ষ হয়েছে। জানো কী নিয়ে? সমাবেশের সামনের সিটে বসা নিয়ে! পুরো প্রোগ্রাম ক্যানসেল, কয়েকজন আহত!”

ইমন হেসে বলল,— “ভাইয়া, মানুষ যখন জীবনের মূল উদ্দেশ্য ভুলে যায়, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপেই অন্ধকার নেমে আসে। অথচ ইসলাম আমাদের সুন্দর একটি সমাধান দিয়েছে। তারা ইসলামের পথে না চলে আত্মসমর্পণ করেছে তাদের নেতাদের কাছে।”

নাসুম সাহেব অবাক হয়ে বললেন,
— “কি বলো! কে সামনে বসবে, এই বিষয়েও ইসলামে সমাধান আছে?”
— “অবশ্যই আছে ভাই! এজন্যই তো কোরআনে বলা হয়েছে—

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবন ব্যবস্থা হিসেবে পসন্দ করলাম।
(সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৩)

আচ্ছা ইমন তাহলে তুমি আমাকে বিস্তারিত বলো এ বিষয়ে ইসলাম কি বলে।

ইমন বলতে লাগলো।তখন আমি মাধ্যমিক পাশ করেছি। আমাদের এলাকায় একজন ভাই ছিলেন, ইসলাম বিষয়ে বেশ জানতেন। ছুটিতে বাড়ি এলে আমরা সবাই মিলে তাঁকে দিয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করি—বিষয়: ‘ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা’।

উনার অনলাইন জনপ্রিয়তার কারণে প্রচুর লোক চলে আসে।আমি আগে গিয়ে বসেছিলাম দ্বিতীয় বেঞ্চে। কিছুক্ষণ পর দুজন ভাই তাদের পাশের বন্ধুকে বলেন, — ‘আমরা একটু পানি খেতে যাচ্ছি, এই যায়গাটা রাখিস।’ তারা চলে গেলে ওই যায়গায় দুইজন এসে বসে পড়ে। বাধা দেওয়া সত্ত্বেও বললো, — ‘এই জায়গা কেউ বুকিং দিছে নাকি?’ পুরোনো দুজন ফিরে এসে অনুরোধ করলো, — ‘ভাই, আমরা আগে বসেছিলাম, একটু পানি খেতে গিয়েছিলাম।’ কিন্তু তারা শুনতেই চায় না। তর্কবিতর্কে হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এর মধ্যে মেহমান ও আসার সময় হয়ে গেছে।

যা ভাবছিলাম তাই হলো মেহমান চলে এসেছে। এবং তাদের ঝগড়া শুনতে পেয়ে জিজ্ঞেস করল এখানে কি হয়েছে। উভয়পক্ষ তাদের কথাগুলো শুনালেন মেহমানকে!! মজার বিষয় হচ্ছে উনি যে আজকের আলোচনার মেহমান অনেকেই জানতেন না। সোসাল মিডিয়াতে অনেকে উনার লেখা পড়েছেন কিন্তু বাস্তবে দেখেননি।

মেহমান গম্ভীর গলায় বললেন,
— ‘আপনারা যেহেতু একটি ইসলামিক সেমিনারে আছেন, আর আজকের আলোচনা হলো “ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা”—আমি যদি ইসলাম থেকে এর সমাধান দিই, আপনারা কি মেনে নিবেন?’
সবাই একবাক্যে বলল,
— ‘হ্যাঁ।’
তারপর তিনি বললেন: “তোমাদের কেউ মজলিস থেকে উঠে গেলে, পরে ফিরে এসে যদি আবার বসে, তবে সে তার পুরনো জায়গার বেশি হকদার।” (বুখারি: আদাবুল মুফরাদ ১১৪৮; আবু দাউদ: ৪৮৫৩)

দেখুন এই হাদীসটি শিষ্টাচার ও সামাজিক আচার-ব্যবহার শেখায়। এতে বোঝানো হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বৈঠকে অংশগ্রহণ করে এবং পরে অস্থায়ীভাবে চলে যায়, তাহলে ফিরে এসে সে তার আগের জায়গায় বসার অধিকার রাখে। অন্য কেউ যদি ওই জায়গা দখল করে নেয়, তবে সেটা শিষ্টাচারের পরিপন্থী হবে।

এটি সমাজে পারস্পরিক সম্মান ও অধিকার বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।

উপকারিতা:

মজলিসে শৃঙ্খলা বজায় থাকে
অন্যের অধিকার আদায়ে সচেতনতা তৈরি হয়
পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

এরপর মেহমানের কথা শোনার পর যারা পরে বসেছিল, তারা চুপচাপ উঠে গিয়ে পেছনে বসে। সেই দিনটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা প্রোগ্রাম।”

এই গল্প শুনে নাসুম সাহেবের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মনে মনে বললেন, — “আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন। সত্যিই, অলৌকিকভাবে তিনি আমাকে একটা সমাধান দেখালেন।”

ইমন বলল, — “ভাইয়া, জানেন আজ আপনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি?” — “না, বলো?” — “সেদিনের সেই প্রোগ্রামের আলোচক—আদিব ভাইয়ের কাছে।” — ”
তাহলে তো ভালোই হয়।”
নাসুম সাহেব রিকশাওয়ালাকে উদ্দেশ করে বললেন, — “মামা, একটু তাড়াতাড়ি চালান। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
(জায়গা দখল)

বই : আমার বন্ধু আদিফ
সাইদুল ইসলাম সজীব
২৯/০৫/২০২৫

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading Logo
Scroll to Top