বিএনপি আজ তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। এই সুযোগে জামায়াত কীভাবে নতুন রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে পারে, তা নিয়েই বিশ্লেষণ।
বিএনপির আত্মবিশ্বাস নাকি আত্মপ্রবঞ্চনা? তরুণ প্রজন্ম ও রাজনীতির বাস্তবতা
বিএনপি আজ এক ভয়ানক রাজনৈতিক আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে তারা এখনো ধরে নিচ্ছে, ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের সেই রাজনৈতিক পরিবেশ আবার ফিরে আসবে। তাই তারা সেই পুরনো কৌশল, পুরনো মুখ, আর “জোর যার, মুল্লুক তার” স্টাইলে রাজনীতি চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু বর্তমান সময়, সমাজ, আর তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই বদলে গেছে।
বিএনপির সবচেয়ে বড় ভুল কোথায়?
সবচেয়ে বড় ক্ষতির জায়গা হলো—তরুণ প্রজন্মকে উপেক্ষা করা। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, ১৯৯৮ সালের পরে জন্ম নেয়া তরুণদের কত শতাংশ আজ বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাটা এখন তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।
এই নতুন প্রজন্মই আগামী দিনের ভোটার, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী, নেতৃত্বদানকারী। অথচ বিএনপি তাদের নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন। বরং তারা এখনো সেই পুরনো নেতাদের নিয়ে, কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছাড়া, আত্মতুষ্টিতে ভুগছে।
কর্মীবাহিনীর ভবিষ্যৎ তো দূরের কথা, নেতাদের মুখের ভাষা নিয়েও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। গালাগালি, দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য, আর জনবিচ্ছিন্ন আচরণই তাদের পরিচয় হয়ে উঠেছে।
ক্ষমতার বাইরে ১৫ বছর – আরেকটি রাজনৈতিক ক্ষয়
গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আরো বড় সমস্যা হলো—২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরেও তারা কোনো জনবান্ধব রাজনীতিতে ফিরতে পারেনি।
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তারা সোচ্চার, তারা জানে তারা কী চায়। একদিকে পুরনো প্রজন্ম ভোট দিতে অনাগ্রহী, অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম ভোট দিতে চায়, এবং তারা কাকে বিশ্বাস করবে সে সিদ্ধান্ত তারা তথ্য-প্রযুক্তি আর আচরণের ভিত্তিতে নেয়।
জামায়াতের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা: কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
এ প্রজন্মের কাছে বিএনপি দিন দিন গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। এখানে জামায়াতের জন্য এক নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হচ্ছে।
এই সময়ে দরকার সাহস ও কৌশলী পরিকল্পনা
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। এ সময়ে জামায়াত ও ইসলামী ঘরানার কর্মীদের সামনে দুটি প্রধান করণীয় রয়েছে:
সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধজয়ের ময়দান:
সোশ্যাল মিডিয়াকে হতে হবে প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু তা হতে হবে দায়িত্বশীল, পরিপক্ব, কৌশলী ব্যবহারের মাধ্যমে।
গুজব ছড়ানো একেবারেই বন্ধ করতে হবে।
অশালীন ভাষা, গালাগালি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হতে হবে।
সর্বোচ্চ ধৈর্য ও আনুগত্যের পরিচয় দিতে হবে।
নেতিবাচক রাজনীতির বিরুদ্ধে ইতিবাচক প্রতিরোধ:
বিএনপির চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিটি গ্রামে, পাড়ায়, মহল্লায় গঠন করতে হবে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাস বিরোধী মিডিয়া সেল।
যারা বিএনপির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত—তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। প্রকাশ্যে অথবা গোপনে, মানুষকে বুঝতে দিতে হবে—জামায়াত জনগণের সাথেই আছে।
একটি নতুন ন্যারেটিভের জন্ম দিতে হবে
এই লড়াই শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়—এটি জনমানস পরিবর্তনের লড়াই। প্রয়োজন একটি সহজ, শক্তিশালী, গণমুখী স্লোগান—
“আমার টাকা আমি রাখবো, তোকে আমি কেন দিবো?”
এই স্লোগান পৌঁছে দিতে হবে রিকশাওয়ালা, শ্রমিক, কুলি, চা দোকানদার, ব্যবসায়ী, মুরুব্বী—সবার মুখে মুখে।
—
উপসংহার
বিএনপি যদি এখনো না বোঝে যে সময় বদলে গেছে, প্রজন্ম বদলে গেছে, আর রাজনীতির ভাষাও বদলে গেছে—তাহলে তাদের রাজনৈতিক পরিণতি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
অন্যদিকে, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের জনশক্তির সামনে এখন এক সুবর্ণ সুযোগ—শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা গড়ে তোলার।
এখনই সময়। সাহস নিন, সংগঠন তৈরি করুন, সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতৃত্ব দিন। ইতিহাস অপেক্ষা করছে নতুন কিছু দেখার জন্য।
আপনার কি মনে হয় জামায়াত এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে? মতামত জানান কমেন্টে।
—
লেখক: সাইদুল ইসলাম সজীব
লেখক ও গবেষক (আখিরুজ্জামান)
দর্শন: রাজনৈতিক বিশ্লেষক | ইসলামি আন্দোলন পর্যবেক্ষক