Akhiruzzaman

গরু কোরবানি নিয়ে দুইটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ: শাহজালাল (রহ.) ও বাবা আদম (রহ.)-এর আত্মত্যাগের কাহিনি

কোরবানির ইতিহাস: /korbani-juddho-shahjalal-baba-adamশাহজালাল ও বাবা আদম শহীদ (রহ.)-এর নেতৃত্বে গরু জবাই নিয়ে দুই ঐতিহাসিক যুদ্ধ।

বাংলার ইতিহাসে গরু কোরবানি নিয়ে সংঘটিত দুইটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ—শাহজালাল (রহ.) বনাম গৌরগোবিন্দ এবং বাবা আদম শহীদ (রহ.) বনাম বল্লাল সেন। জানুন এই ইবাদতের পেছনে রক্তঝরা ইতিহাস ও মুসলিম নিপীড়নের নির্মম সত্য।


কুরবানির ঈদ

শাহজালালের বাংলায় পালিত হলো আরো একটি কোরবানির ঈদ। কুরবানী  মুসলমানদের ধর্মীয় ইবাদাত গুলোর মধ্যে অন্যতম এক তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু আমাদের প্রজন্ম কি জানে শুধুমাত্র গরু জবাই কে কেন্দ্র করেই এই উপমহাদেশে হয়েছে দুইটি যুদ্ধ ।

ইতিহাস সাক্ষী, হিন্দু রাজা লক্ষণ সেন ও রাজা গৌর গোবিন্দের সঙ্গে মুসলমানদের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ হয়েছিল। এক সময় কেবল গরু জবাইয়ের কারণে অসংখ্য মুসলমানকে জীবন দিতে হয়েছে। কী নির্মম পরিহাস—যে সমাজ গরুকে মা হিসেবে পূজা করে, সেই সমাজই মানুষ হত্যাকে বিচারযোগ্য মনে করে না। অথচ আবার সেই সমাজেই ছাগলের মাথা কেটে পূজার মানত করা হয়! এ যেন এক নিছক তামাশা নয়, এক নির্মম বাস্তবতা।

এখনো কোরবানি এলে গৌর গোবিন্দ আর লক্ষণ সেনের উত্তরসূরিরা যেন সেই চিরসেনার মতো গাত্রদেহ উন্মোচন করে—ব্যক্ত করে তাদের বিরূপতা, যেন ইতিহাস এখনও বেঁচে আছে তাদের রক্তে।মনে হয় কেবল  সুযোগের অপেক্ষায় আছে তারা লক্ষণ সেন কিংবা গৌরগোবিন্দ হওয়ার।

আমাদের করণীয়

বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে আমাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্ম জানতে পারে সেই গৌরবময় ইতিহাস। আজ যে আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কোরবানি পালন করছি, তা সম্ভব হয়েছে তাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই—যাঁরা নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন আমাদের স্বাধীন বিশ্বাসের জন্য।

 

১. সিলেটের গরু কোরবানি ও গৌরগোবিন্দের সাথে শাহজালাল (রহ.)-এর যুদ্ধ

 

সময়কাল:

১৩০৩ খ্রিস্টাব্দ (হিজরি ৭০৪) স্থান:সিলেট, গৌরগোবিন্দ শাসিত রাজ্য

মুসলিম নির্যাতন

গৌন্দের রাজ্যের এক মহল্লায় ১৩টি মুসলিম পরিবার বসবাস করতেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন পরহেজগার ও ধার্মিক ব্যক্তি শেখ বুরহান উদ্দিন। হিন্দু জালিম রাজা গৌর গোবিন্দের ভয়ে তিনি গোপনে ইবাদত-বন্দেগী করতেন, কারণ সেখানে প্রকাশ্যে মুসলমানদের ইবাদত করা নিষিদ্ধ ছিল। কেউই কোরবানি করতে পারত না, গরু জবাই তো ছিল এক প্রকার মৃত্যুদণ্ডের শামিল।

 

শেখ বুরহান উদ্দিনের কোনো সন্তান ছিল না। তিনি সন্তান লাভের আশায় মহান আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে দোয়া করলেন এবং নিয়ত করলেন—আল্লাহ যদি তাঁকে একটি সন্তান দেন, তবে তিনি শুকরিয়া স্বরূপ একটি গরু কোরবানি করবেন।

কিছুদিন পর আল্লাহ পাক তাঁর দোয়া কবুল করলেন। ঘর আলো করে এক ফুটফুটে পুত্র সন্তান জন্ম নিল। সন্তানের নাম রাখা হলো গুলজার। বুরহান উদ্দিন আনন্দে আত্মহারা হয়ে একদিন গোপনে একটি গরু কোরবানি করলেন এবং সেই গোশত এলাকার মুসলমানদের মাঝে বিতরণ করতে লাগলেন।

ঠিক সেই সময় এক টুকরো গোশত একটি কাক তুলে নিয়ে উড়ে গেল। আল্লাহর কী কুদরত! কাকটি সেই গোশতের টুকরাটি গিয়ে ফেলল গৌর গোবিন্দের মন্দিরের মূল ফটকে। রাজা গোবিন্দ এতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে সৈন্য পাঠিয়ে শেখ বুরহান উদ্দিনকে ধরে আনার নির্দেশ দিল।

 

শেখ বুরহান উদ্দিনকে রাজদরবারে হাজির করা হলো। নির্মম গোবিন্দ তাঁর ডান হাত কেটে দিল। সদ্যজাত সেই নিষ্পাপ শিশুকে কথিত দেবতার সামনে বলি দেওয়া হলো। শিশুটির মা, এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে মূর্ছা যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়।গোবিন্দের আদেশে ওই দিনই গোটা মুসলিম মহল্লায় হামলা চালানো হয়। একে একে ১৩টি মুসলিম পরিবারকে নির্মমভাবে শহীদ করে ফেলা হয়।চরম ব্যথিত হৃদয়ে, চোখে অশ্রু নিয়ে শেখ বুরহান উদ্দিন পায়ে হেঁটে রওনা দিলেন সোনারগাঁয়ের শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের দরবারে। সব শুনে ইলিয়াস শাহ গোবিন্দকে শাস্তি দিতে সৈন্য পাঠালেন। যুদ্ধ হলো, বহু মুসলিম সৈন্য শহীদ হলেন, কিন্তু গোবিন্দকে পরাজিত করা সম্ভব হলো না।

 

রাজা গৌরগোবিন্দের শোচনীয় পরাজয়।

এরপর বুরহান উদ্দিন দিল্লির দিকে রওনা হলেন এবং পৌঁছালেন দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ তুঘলকের দরবারে। ঘটনাপর্ব সব শুনে সম্রাট গোবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে সৈন্য পাঠালেন। সেনাপতি করা হলো সিকান্দার গাজীকে। কিন্তু পথে নানা প্রতিকূলতা দেখা দেওয়ায় তারা দিল্লিতেই ফিরে এল।পরবর্তীতে আরেক দফা সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা হলো এবং এইবার সেনাপতি নিযুক্ত হলেন এক বীর সৈয়্যিদ—নাসির উদ্দিন। তিনি রওনা দেওয়ার আগে দোয়া নিতে গেলেন তাঁর পীর, হযরত খাজা নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার দরবারে। ঠিক তখনই সেখানে অবস্থান করছিলেন একজন অলীয়ে কামিল—হযরত শাহ জালাল (রহ.)। সবকিছু শুনে তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন—এই যালিম রাজাকে শাস্তি দিতে তিনিও যাবেন।অতঃপর হযরত শাহ জালাল (রহ.) তাঁর ৩৬০ জন সঙ্গীসহ সৈয়্যিদ নাসির উদ্দিনের বাহিনীর সঙ্গে অভিযানে রওনা দিলেন।পথিমধ্যেই শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। কিন্তু আল্লাহর অলিদের দোয়া, হযরত শাহ জালালের রুহানিয়ত এবং মহান আল্লাহর গায়েবী সাহায্যে গোবিন্দের যাদু-মন্ত্র সব ব্যর্থ হয়ে যায়। যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয় গোবিন্দের সেনাপতি মনা রায়।

মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হতে থাকল গৌর গোবিন্দের রাজধানীর দিকে। সুরমা নদী পার হয়ে তারা যখন রাজপ্রাসাদের একেবারে নিকটে পৌঁছে গেল, তখন রাজা গোবিন্দ প্রাণ ভয়ে প্রাসাদ ছেড়ে পালিয়ে যায়।

 

তার পতনের পর আযানের ধ্বনিতে গর্জে ওঠে আকাশ। গৌর গোবিন্দের রাজপ্রাসাদ ও মন্দির ভেঙে ধ্বংস হয়ে যায়। উদিত হয় নতুন সূর্য, নতুন ইতিহাস। উড়তে থাকে ইসলামের বিজয়পতাকা।

গৌর গোবিন্দের রাজ্যের নাম পাল্টে রাখা হয় “জালালাবাদ”—হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর নামানুসারে।

২: সেন রাজাদের সময় গরু জবাই নিষিদ্ধ ও মুসলিম নিপীড়ন

 

🕰 সময়কাল:

১১শ – ১২শ শতাব্দী

 স্থান:প্রাচীন গৌড়, নদিয়া ও বাংলা অঞ্চল (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের কিছু অংশ)

 

“১১৪২ খ্রিষ্টাব্দে, সূদূর আরবের পবিত্র ভূমি তায়েফ থেকে বাংলার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন এক আল্লাহওয়ালা বুজুর্গ, নাম বাবা আদম শহীদ (রহিমাহুল্লাহ)। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটিই—বাংলার মাটিতে ইসলামের শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়া।”তিনি বিক্রমপুরে (বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ) আগমন করেন এবং শুরু করেন ইসলামের দাওয়াত। কিন্তু সমস্যা বাঁধে একটি গরু কোরবানিকে কেন্দ্র করে। তৎকালীন সেন রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা বল্লাল সেন মুসলিমদের এই কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবা আদম (রহঃ) প্রতিবাদ করেন। তিনি বললেন,“আমরা মুসলমান, কোরবানি করা আমাদের ধর্মীয় অধিকার।”

 আর সেই অধিকার রক্ষার জন্যই শুরু হয় এক ঐতিহাসিক লড়াই।

 

১১৭৪ সালে বিক্রমপুরের কানাইচং ময়দানে মুখোমুখি হন দুই পক্ষ। আল্লাহর অদৃশ্য সহায়তায় বাবা আদম শহীদ (রহঃ) জয়লাভ করেন। কিন্তু ৪ বছর পর, রাজা বল্লাল সেন প্রতিশোধের আশায় রাতের আঁধারে বিশ্বাসঘাতকভাবে শহীদ করে দেন তাঁকে। তিনি তখন নামাজে ছিলেন… সিজদায় মাথা ছিল।

 

এর পরবর্তীতে আল্লাহ তা’আলা বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে এই অভিশপ্ত রাজবংশকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করে দেন। এ ঘটনাই ছিল উপমহাদেশে গরু জবাই ও ভক্ষণকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া অন্যতম প্রথম বড় ইতিহাস।

আজ আমরা দেখতে পাই, ভারতবর্ষে ঠিক একইভাবে মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে ‘গরু’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে।

 

💬 তাদের পতন নিশ্চিত করার জন্য আজ আমাদেরকেই হতে হবে নতুন বখতিয়ার।

 

📣 চলো, নতুন প্রজন্মকে জানাই আমাদের ইতিহাস। শেয়ার করো এই পোস্ট — হোক চেতনার আলো সবার মাঝে ছড়িয়ে।

 

সাইদুল ইসলাম সজীব

লেখক ও গবেষক (আখিরুজ্জামান)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading Logo
Scroll to Top