বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামপন্থীদের অবস্থান ও জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কতটা কঠিন হতে যাচ্ছে, তার বিশ্লেষণ। ইসলামী ঐক্য, নির্বাচন ও বাস্তবসম্মত করণীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত।
বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ ও জামায়াতের জন্য আসন্ন চ্যালেঞ্জ
সাইদুল ইসলাম সজীব | ২৩/০৫/২০২৫
জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনীতি অনেক কঠিন হতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আমার মনে হচ্ছে, ইসলামপন্থীরাই বড় কারণ হবে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে—জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কঠিন হওয়া মানে ইসলামপন্থীদের ভবিষ্যৎও কঠিন হওয়া।
ইসলামপন্থীদের বর্তমান সংকট
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা উভয় সংকটে আছে। ইসলামের বাইরে গেলে কাউকে বিশ্বাস করার মতো পরিস্থিতিতে তারা নেই। না NCP-কে, না BNP-কে—কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না।
আপনি একবার বিএনপির তৃণমূলের দিকে লক্ষ্য করুন, স্পষ্ট বোঝা যায়—বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, তাদের হাই কমান্ড যদি তৃণমূলকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে এক ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটবে
BNP ও ইসলামী রাজনীতি: একটি বিভ্রান্তিকর সম্পর্ক
বিশ্ব রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিগত সময়ে বিএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতি আর এখনকার বিশ্ব পরিস্থিতি ও বিএনপির রাজনীতি এক নয়। যদি পূর্বের প্রেক্ষাপট ধরি, তাহলে ইসলামপন্থীদের সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী ছিল বিএনপি। কিন্তু এখন সে আশা করাটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে
ঐক্যে অপরিহার্যতা
সত্যিই বলতে, এই ভূখণ্ডের রাজনীতি ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কোনো অপশন নেই ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া। আপনি বিএনপির বাইরে যাদের সমর্থন দেবেন, তারা সুযোগ পেলে বড় ইসলামবিরোধী কাজ করতে প্রস্তুত থাকে। আবার বিএনপিকে ক্ষমতায় আনলেও, সেখানে আপনাকে দুটি বিষয়ে চিন্তা করতে হবে:
১. বিএনপি কি পূর্বের মতো জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ওপর টিকে থাকবে?
২. নাকি বিদেশি শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভিন্নধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করবে?
আরেকটি চিন্তা হল—বিএনপির এগ্রেসিভ কর্মীবাহিনী (যারা ইতিমধ্যে নিজেদের চেহারা প্রকাশ করেছে) ভবিষ্যতে কত বড় সামাজিক অবক্ষয় ঘটাবে, তা কল্পনা করাই যায় না।
মোট কথা হলো—আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে, বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা এনসিপি (যারা ইতিমধ্যে তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে প্রমাণ করেছে), এদের সঙ্গে শরিয়া প্রতিষ্ঠাকারী ইসলামী দলগুলোর সংঘাত অনিবার্য।
আর আমি সবচেয়ে বড় ভয় পাই ইসলামপন্থীদের নিয়েই।
কেন তা বলছি… অপেক্ষা করুন।
এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় ছিল—(দল হিসেবে) আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসররা যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাদের বিচারের দাবি নিশ্চিত করা। কিন্তু হতাশাজনকভাবে অন্তর্বর্তী সরকার সে ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। তবে এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। সবাই না আসলেও, ইসলামী শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে চাইলে এই দাবি বাস্তবায়ন সম্ভব। মনে রাখতে হবে গাজওয়াতুল হিন্দ যেহেতু এই ভূখণ্ড রাজনৈতিক বাস্তবতা। তাই ভারতের অগ্রগামী বাহিনী আওয়ামী লীগ নিয়ে কোন ছাড় নেই।
এর পর অন্তবতী সরকার তুলনামূলকভাবে কিছু সংস্কার শেষ করার সাথে সাথে নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করা। বর্তমান সরকারকে বেশি সময় দেওয়া বিপজ্জনক হবে। কারণ উপদেষ্টামণ্ডলীতে কিছু চিহ্নিত ইসলামবিরোধী উপদেষ্টা বসে আছেন। অতএব নির্বাচন নিয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু নির্বাচন হবেই এবং আগামী নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের বড় অংশীদার, তাই বিএনপির সাম্প্রতিক কার্যক্রম দেখে ইসলামপন্থীদের পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
কয়েকটি বিষয় ফোকাস করা উচিত।
এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, তবুও যেন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়। এই বিষয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া দরকার। কিন্তু এই কাজটিকে কঠিন করে তুলছে মূল ধারার কিছু ভাইয়েরা—যারা বিগত সময়ে গণতন্ত্রকে হারাম বলে নিরপেক্ষ থেকেছেন (ভোট বর্জন করেছেন)। এরপর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ নামক জাহিলিয়াত। এবারও কি তাহলে একই কাজ হবে? এবারও তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না, বিএনপি ক্ষমতায় আসবে—এরপর কী হবে, তা আর ব্যাখ্যার দরকার প্রয়োজন মনে করি না ।
আরে ভাই, গণতন্ত্র হারাম—হারামই থাকবে এবং তা কেয়ামত পর্যন্ত হারাম । কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বাইরে গিয়ে কিছু করার সুযোগ আছে? আপনি কিভাবে গণতন্ত্রকে নিষিদ্ধ করবেন? গণতন্ত্র কি জামায়াত প্রতিষ্ঠা করছে না হেফাজত করছে? এটাতো প্রতিষ্ঠায় আছে আপনাকে সিস্টেমে ঢুকেই সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। এর জন্য সময় এবং যথেষ্ট ক্ষমতা দরকার, যা আমাদের এখন নেই।
এখন সেই ভাইদের বলতে চাই—জামায়াতের কোনো নেতা কি কখনো বলেছেন, গণতন্ত্র দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব? দেখাতে পারবেন? আরে ভাই, এই ভূখণ্ড তো বাংলাদেশ—কেন বুঝেন না? একাত্তরে এখানে মুসলিমরা ভারতের কাছে পরাজিত হয়েছে।
আরেকটা প্রশ্ন—জামায়াত সংসদে গিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে কী হয়েছে, আর ইসলামের পক্ষে কী হয়েছে—তার একটি মূল্যায়ন করা উচিত। জামায়াতের অবশ্যই উচিত—এই পক্ষের নেতৃত্বদানকারী ভাইদের সঙ্গে বসা। কারণ, এদের সংখ্যা বর্তমানে অনেক বেশি এবং এরা খুব সাহসীও।
দ্বিতীয়তঃ যেসব ইসলামী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, সেসব অঞ্চলে যেখানে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই, সেখানে তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে জামায়াতকে সমর্থন করা উচিত। জামায়াতেরও উচিত হবে—জোটগতভাবে কিছু আসন ইসলামি দলগুলোকে ছেড়ে দেওয়া। এক্ষেত্রে চরমোনাই, খেলাফত মজলিস, হেফাজত—জামায়াতের নেতৃত্বে এক হতে হবে, না হলে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। যদি এক হওয়া যায় ক্ষমতায় জামায়াত ও ইসলামী দলগুলো চলেও আসতে পারে।
মনে রাখবেন— এ বাংলার আপামর জনতার অধিকাংশই ইসলামপ্রিয়। জুব্বা-পরা, দাঁড়িওয়ালা, পাঞ্জাবি-পরা মানুষেরা যখন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ইসলামী শক্তির পক্ষে ভোট চাইবে—বিএনপি হাজার টাকা দিলেও সেই ভোট ব্যালটবক্সে নিতে পারবে না। এটাই বাস্তবতা।
এখন সিদ্ধান্ত আপনার— ঐক্যবদ্ধ হবেন, নাকি বিএনপির হাতেই আবারো মারা খাবেন?
নির্বাচনের বাইরে গিয়ে যদি বিপ্লব সম্ভব মনে করেন, তাহলে বলুন—জামায়াত আপনাদের সহযোগিতা করবে। তবে মনে রাখবেন—সশস্ত্র উপায়ে এই ভূখণ্ডে ইসলাম প্রতিষ্ঠার এখনো সময় আসেনি।
দিগন্তে কালো মেঘ জমছে—হয়তো এই মেঘ সরে গিয়ে সোনালি সূর্য উদিত হবে। না হলে দীর্ঘ অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিন। লোকাল এবং আন্তর্জাতিক—সব মিলিয়ে আপনারা মারা খাবেন।
আল্লাহ আমাদের কুদরতি মতো দান করুন।বিবেকের চক্ষু খুলে দিন। এবং ঐক্যবদ্ধ করুন।
সাইদুল ইসলাম সজীব
২৩/০৫/২০২৫